খালিল জিবরানের কবিতা ( বাংলা অনুবাদ ) – রণেশ রায়

Ranesh Ray

খালিল জিবরানের  কবিতা প্রসঙ্গ ও তার কিছু বাংলা অনুবাদ

জন্মসূত্রে সূত্রে খালিল জিবরান লেবানিওন হলেও তিনি একজন মার্কিন বাসিন্দা। লেবানিয় মার্কিন সাহিত্যিক বলে প্রখ্যাত। তাঁর জন্ম ৬ ই জানুয়ারি ১৮৮৩ সালে লেবাননে। প্রয়াণ ১০ ই এপ্রিল ১৯৩১ সালে আমেরিকার নিউ ইয়র্কে। তাঁর মা মার্কিন মুলুকে কর্মরত থাকায় তিনি ১৮৯৫ সালে আমেরিকায় আসেন। আমেরিকার বোস্টনে স্কুলে তাঁর প্রাথমিক স্তরের পড়াশুনা।

লেবাননের বিরাটে তিনি আসেন উচ্চশিক্ষার জন্য।১৯০২ সালে আবার আমেরিকায় এসে তাঁর বসবাস ও কর্ম জীবন।সামান্য কর্মজীবী হিসাবে জীবন যাপন করেন সঙ্গে শিল্প সাহিত্য। তাঁর প্রতিভার পরিচয় পেয়ে তাঁকে একজন স্কুল শিক্ষক বিশেষ সহায়তা করেন। বোন ও মা মারা যাওয়ার পর তিনি আর্থিক সংকটে পড়েন। তবে তাঁর প্রতিভার স্ফুরণ হতে থাকে তাঁর সাহিত্য প্রতিভা দার্শনিক ভাবনা চিন্তা নিয়ে । জীবন কাটে সাহিত্য সেবক হিসেবে।

বিশ্ব শিল্প সাহিত্যে খালিল জিবরান একজন অমর ব্যক্তিত্ব। শিল্প সাহিত্যে তাঁর অবদান বিশ্বসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। সাহিত্য শিল্পের জগতে তিনি সাহিত্যের বিভিন্ন বিভাগে একজন লেখক, বিখ্যাত কবি। একজন অঙ্কন শিল্পী। সর্বোপরি একজন দার্শনিক। তাঁর দর্শনের আয়নায় তাঁর সাহিত্য চর্চ্চা নিপুণ ভাবে প্রতিফলিত হয়।

তাঁর গদ্যে লেখাগুলির মধ্যে যেমন ফুটে উঠেছে এক মহাকাব্যের প্রেরণা তেমনি কবিতায় খুঁজে পাই গল্পের শ্রুতিমধুর আলাপচারিতা। তার আঁকা ছবিগুলো যেন কবিতা হয়ে ফুটে ওঠে আমাদের মানসপটে। প্রকৃতি প্রেম ও পরমেশ্বর নিয়ে তাঁর দার্শনিক ভাবনাকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর লেখনীতে। নৈসর্গিক প্রেম প্রকৃতির অসীম ক্ষমতা আর পরমেশ্বর বা prophet তাঁর মানবতার ধর্মের সঙ্গে একাত্মতা অর্জন করেছে।

তাঁর কবিতা সার্বজনীন হয়ে উঠেছে। সে দিক থেকে তিনি সাহিত্য চর্চায় আমাদের রবীন্দ্রনাথের সমগোত্রীয় যেখানে প্রেম পূজা আর প্রকৃতি সাহিত্যের মোহনায় মিলেছে। শিল্পবিপ্লব পরবর্তী আধুনিক কালের একজন রোমান্টিক কবি তিনি। তাঁর সাহিত্য চর্চায় প্রকৃতি প্রেম আর পরমেশ্বরবাদকে কেন্দ্র করে বেষ্টন করে আছে তাঁর রোমান্টিকতা। তিনি একেশ্বরবাদী সর্বশক্তিমান এক ক্ষমতায় বিশ্বাসী যাকে তিনি তাঁর সাহিত্য চর্চ্চায় প্রকৃতির আসনে বসিয়েছেন। নৈসর্গিক প্রেম আর মানুষে মানুষে নিঃস্বার্থ কল্যাণকর সম্পর্কের ভাবনা তাঁকে মানবতার পূজায় দীক্ষিত করেছে। জন্ম মৃত্যুকে প্রকৃতির নিয়ম বলে মেনে নেওয়া তাকে গ্রহণ করতে পারার মধ্যে তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষকে খুঁজে পেয়েছেন।

তাঁর প্রতিটি লেখায় বিশ্ব মানবিকতা তথা বিশ্ব ভাতৃত্ব বোধ এক অনন্তের ( Eternity ) মাত্রা পেয়েছে যা আমরা রবীন্দ্র দর্শনে পাই। সেজন্য তিনি মানুষে মানুষে শোষণ নিপীরণকে নিন্দা করেছেন। নিপীড়িত মানুষের পক্ষ নিয়েছেন। প্রেম নৈস্বর্গিক সার্বজনীন বিষয় বলে বিবেচনা করেছেন। এই অনন্তের ধারণাই তাঁর পরমেশ্বরবাদ। প্রকৃতির দুর্বার শক্তির প্রতি তিনি ছিলেন অনুগত। প্রকৃতির দুর্বেধ্য ক্ষমতাকে পরমেশ্বরের আসনে বসিয়েছেন । এ কোন আনুষ্ঠানিক ধর্ম ও ঈশ্বরজ্ঞান নয়। সেই জন্যই একই সঙ্গে তাঁর সাহিত্য সার্বজনীন হয়ে উঠেছে। সেইজন্যই তাঁকে আন্তর্জাতিক সমাজ শুধু একজন সাহিত্যিকের মর্যাদা দেননি তাঁকে দার্শনিক বলে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

তিনি নিজে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তাঁকে এই মর্যাদায় ভূষিত করার বিরোধিতা করেছেন। তিন একজন ভাববাদী দার্শনিক ছিলেন। তাঁর ভাববাদের দর্শন মানবতার ধর্মকেই প্রাধান্য দিয়েছে। ভাব ও বস্তুর মধ্যে তিনি তাঁর দর্শনে ভাবকে মুখ্য আর বস্তুকে গৌণ বলে বিবেচনা করেছেন। সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে জীবন দর্শনের এ দিকটা প্রাধান্য পেয়েছে।

সাহিত্যের জগতে এমনি একজন সার্বজনীন ব্যক্তিত্ব খালিল জীবরান। তাঁর লেখা ইংরেজি কবিতার বাংলা অনুবাদ করে আমি বাংলা সাহিত্য চর্চায় তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করার দুঃসাহস দেখাচ্ছি। বাংলা সাহিত্য চর্চ্চায় তাঁর লেখা কবিতার অনুবাদগুলো বাংলা সাহিত্যের অঙ্গ হয়ে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব সাহিত্যের আঙ্গিকে আরও পুষ্ট করে তুলতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।

তাতে যদি আমি সামান্যতম অবদান রাখতে পারি তবে নিজেকে ধন্য মনে করব।যেমন রবীন্দ্র সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যে অবদান রেখে গেছে আবার তা বাংলা সাহিত্যকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। এই প্রসঙ্গে অনুবাদ কবিতা নিয়ে আমি আমার ভাবনাটা তুলে ধরছি যা এখানে প্রাসঙ্গিক। অন্যত্র আমার এই ভাবনাটা ইতিমধ্যে তুলে ধরেছি। উদ্ধৃতি হিসেবে নিচে সেটা তুলে ধরলাম :

“ভাষান্তরিত তথা অনুবাদ সাহিত্যের একটা বৃহত্তর দিক আছে যেটা নিয়ে দুচারটে কথা বলে নেওয়া যেতে পারে। আমি সাহিত্যের লোক নই। কোন বিদেশি ভাষায় পন্ডিত নই। তাও যেটা ভাবি সেটা বলার স্পর্ধা দেখাচ্ছি। এছাড়াও নিজে কিছু কবিতার ভাষান্তরের চেষ্টা করেছি। সেগুলো পরিবেশন করার আগে নিজের কয়েকটা কথা নিজে বলে নিচ্ছি। কোন কবিতার ভাষান্তর করা হলেও যিনি এটা করেন তাঁর ভাবনাটা নিজের অজান্তে হলেও জুড়ে যায় ভাষান্তরিত কবিতাটিতে কবির ভাবের সঙ্গে। কবিতাটি অন্য মাত্রা পায়।

স্বাদটা বদলায়। এখানে যিনি ভাষান্তর করেন তাঁর স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সেটা আরও ভালো হতে পারে আবার কারও ভালো নাও লাগতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় সাহিত্য সৃষ্টিতে দুটো সংস্কৃতির মধ্যে বিরোধ ও মিলনের মধ্যে দিয়ে এক নতুন সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়। যাকে সংস্কৃতায়ন বলা চলে। এক ভাষাভাষীর মানুষ অন্য ভাষাভাষীর মানুষের সঙ্গে মননের দিক থেকে একাত্ম হয়। মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল,সুভাষ মুখোপধ্যায়ের অনুবাদ ধর্মী তথা ভাষান্তরিত কবিতায় সেটা আমরা পাই। বোধ হয় এটাকেই সংস্কৃতায়ন বলা হয়। ইংরেজিতে একে সিন্থেসিস বলা চলে। রবীন্দ্রনাথের ‘দুঃসময়’ এমনি একটা অসাধারন কবিতা যেটাতে ইংরেজ কবি কিটসের ‘Ode To A Nightangle’ কবিতার ভাবটি রবীন্দ্রনাথের স্বকীয়তায় প্রস্ফুটিত।

মধুসূদনের কবিতার ভান্ডারও এই স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ। নজরুলের কবিতায় উর্দু ভাষার অসাধারণ সমন্বয় ধরা পড়ে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘জেলখানার চিঠি’ তুরস্ক কবি নাজিম হিকমতের কবিতার অসাধারণ ভাষান্তর। আমরা যারা রাজনৈতিক কারণে জেলে ছিলাম তাদের এই কবিতাটা হৃদয় স্পর্শ করে যায়। মনে হয় আলিপুর প্রেসিডেন্সি বা বহরমপুরের কোন জেলে বসে আমাদের কোন কমরেড এই কবিতা লিখে গেছেন। এখানেই অনুবাদ কবিতার তাৎপর্য, সার্থকতা।

সাহিত্যের আন্তর্জাতিকরণের মাধ্যম হলো এই ধরণের কবিতা। আন্তর্জাতিকতাবাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তি এটা। একে নেহাৎ অনুবাদ কবিতা বলে নকল বলে উপেক্ষা করার একটা প্রবণতা অনেক উন্নাসিক ব্যক্তির মধ্যে আছে। তাঁরা এর মধ্যে লেখকের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব দেখেন না। সাহিত্যকে মানবতার মহাসাগরের মোহনায় মিলতে দেখেন না। এটা খুব দুর্ভাগ্যের। এক ধরনের অহং এর পেছনে কাজ করে।”

জিবরানের সাহিত্যের প্রতিটি বিভাগে যেন চরম শক্তিমান এবং ভবিষ্যৎদ্রষ্টা স্বয়ং উপস্থিত লেখকের সঙ্গে আলাপচারিতায়। ভবিষ্যত দ্রষ্টা পরমেশ্বর যেন হাজির কবির সাহিত্য চর্চায়। তাকেই কবি Prophet বলে তুলে ধরেছেন। সর্বজ্ঞানী ভবিষ্যত দ্রষ্টার শিক্ষা ও বাণী সর্বসমক্ষে তুলে ধরা হয়েছে তাঁর সাহিত্যে। লেখকের কথাগুলো যেন তাঁর কথাই সাহিত্যের আঙ্গিকে লেখা।

জন্ম মৃত্যু নিয়ে লেখা Grave-Digger কবিতায় অলঙ্ঘনীয় প্রকৃতির নিয়মকে তুলে ধরা হয়েছে।মানুষ তখনি মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে উঠতে পারে যখন হাসিমুখে সে মৃত্যু বরণ করতে পারে। সে তখন সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর তথা ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার আশীর্বাদ পায়। ধরা হয় সেখানে প্রকৃতি মানুষের সৃষ্টি কর্তা। মৃত্যুও তাঁর হাতেই। কবিতাটি মাত্র চার লাইনের কিন্তু গভীর অর্থবাহক। বাংলা অনুবাদে আমি কবিতাটাকে সম্রসারণ করেছি। আমার ভাবনাটা যোগ করেছি। পাঠক পাঠিকার সুবিধার্থে ইংরেজি কবিতাটা নীচে দিলাম। বাংলায় কবিতাটার নাম দিয়েছি ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’।

The Grave-Digger
BY KAHLIL GIBRAN
Once, as I was burying one of my dead selves, the grave-digger came by and said to me, “Of all those who come here to bury, you alone I like.”

Said I, “You please me exceedingly, but why do you like me?”

“Because,” said he, “They come weeping and go weeping—you only come laughing and go laughing.”

Song of The Rain (বৃষ্টির গান) কবিতায় জন্ম মৃত্যুর রহস্য তুলে ধরা হয়েছে কাব্যিক নৈপুণ্যে। কবিতাটিতে প্রকৃতির জন্ম চক্রের রহস্য তুলে ধরা হয়েছে যা বাংলায় বৈজ্ঞানিক জগদীশ বোসের ‘ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে‘ নামক লেখাটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। On Love and Marriage কবিতায় কবি প্রেম ও বিবাহের মধ্যে তফাৎ তুলে ধরেন। দুটোকে পৃথক সত্তা বলে তুলে ধরেছেন। বিবাহ এই বস্তুজগতের প্রয়োজনের তাগিদে নারী পুরুষের এক আনুষ্ঠানিক বন্ধন।

যেখানে প্রেম দুটি আত্মার নৈসর্গিক মিলন বন্ধন যা দৈনিক প্রয়োজনের উর্ধে এক আধ্যাত্মিক মিলন। নেহাৎ দৈহিক মিলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিবাহ তখনই প্রেমের মর্যাদা পেতে পারে যখন নরনারী দৈহিক সম্পর্কের উর্ধে উঠে তা দেহাতীত করে তুলতে পারে।

খালিল জিবরানের A Lover’s Call Xxvii কবিতাও তাঁর প্রেম সম্পর্কে এই ভাবনাটার প্রতিফলন। প্রেমিকা যখন তার প্রেমিককে হৃদয়ের মধ্যে খোঁজেন প্রেমিক তখন এ মর্ত জগত ছেড়ে অবস্থান করে স্বর্গ রাজ্যে যেখানে সে সুন্দরের পূজারী। মানবতার মধ্যেই তার অবস্থান। তাকে পাওয়া যায় নেহাৎ দৈহিক মিলনে নয় আত্মিক মিলনে। দুজনের ওষ্ঠের মিলনকে তিনি আত্মিক মিলনের প্রতীক বলে তুলে ধরেন যা দেহকে অবলম্বন করলেও দেহাতিত, কাব্যে তা উন্মোচিত হয় যখন তিনি লেখেন:

মনে করে দেখ সেদিন
বিদায় জানিয়েছিলাম তোমাকে
আমার ঠোঁটে তোমার চুম্বন স্পর্শ
আমি বুঝতে পারি
সে যে প্রেমের প্রতীক আমাদের
সে এক স্বর্গীয় গোপনতা
জিভে যা উচ্চারিত হতে পারে না ।

A Tear and a Smile কবিতাটি আরেকটি অসাধারণ কবিতা, কাব্যগুণে ভরপুর। জীবনে হাসি কান্না বাদ বিবাদকে কবি পরিপূরক হিসেবে দেখিয়েছেন কবিতার মূর্ছনায়। একটা থাকলে আরেকটা থাকে। একটা আরেকটার অনুসারী। বিরোধের মধ্যে ঐক্যের শর্ত নিহিত থাকে বলে দেখা যায়। আমরা ওপরের আলোচনার প্রেক্ষাপটে নিচের অনুবাদ কবিতাগুলো তুলে ধরলাম যা কাব্যিক মহিমায় কবি জিবরানের জীবন দর্শনকে তুলে ধরে।

কবি মৃত্যু রহস্য খোঁজেন মৃত্যুর অনিবার্যতা মধ্যে। জীবন ও মৃত্যুর মিলন মোহনায়। জন্ম থাকলেই মৃত্যু থাকে। জীবনের অনিবার্য নিয়ম তা। কেউ তাকে এড়াতে পারে না। জীবন আর মৃত্যুকে তিনি সাগর আর নদী বলে উল্লেখ করেছেন। উভয়ের মধ্যে তফাৎ নেই বলে তিনি মনে করেন। একই জীবনের দুটি অবস্থান। তাই তিনি On Death কবিতায় বলেন:

যদি জানতে চাও মৃত্যু রহস্য
যদি পেতে চাও তাকে তার মহিমায়
ভাসিয়ে দাও জীবন হৃদয় সমুদ্রে
খোঁজ তাকে জীবন দরিয়ায়
জীবন মৃত্যুর আলিঙ্গনে
তাকে চিনবে তোমার অন্তর্দৃষ্টিতে
পাবে তাকে সৃষ্টির নিয়মে,
যদি না খোঁজ জীবন দুয়ারে,
কোথা পাবে তাকে!
জীবন আর মৃত্যু
সে যে সাগর আর নদী
তফাৎ থাকে না দুজনে।

খালিল জিবরানের কবিতা প্রসঙ্গ ও তার কিছু বাংলা অনুবাদ

কবির লেখা Fear নামক কবিতায় মানুষের এগিয়ে যাওয়ার পথে যে প্রতিবন্ধকতা তার সম্পর্কে ভয়কে অমূলক বলে কবি মনে করেন ঠিক যেমন পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণার নদীর প্রবাহ বয়ে সমুদ্রে যাত্রার পথে মুহূর্তের জন্য তাকে বিচলিত করে ভীত করে তোলে এগিয়ে চলতে গিয়ে মৃত্যুভয় তাকে তাড়িত করে। কিন্তু জীবনকে ঝর্নাকে তাও এগোতে হয় কারণ জীবনের গতি সম্মুখ পানে। সে পিছু হটে না।

আমরা নীচে ওপরে আলোচিত বিষয়গুলো যে কবিতাগুলোতে প্রতিভাত হয়েছে বাংলা ভাষায় তার কয়েকটা তুলে ধরলাম। ধরলাম।

জিবরানের লেখা Grave-Digger কবিতার ভাষান্তর

মৃত্যুঞ্জয়ী

কোন একদিন এক বিষণ্ণ রাতে
আমি এসেছিলাম এ আঁধারে
এসেছিলাম এ সমাধি পরে
নিজের কোন এক অহংকে
যাব আমি নিজেই সমাধিস্থ করে।

কবর খানায় দেখি সমাধি দাঁড়িয়ে
কার কন্ঠস্বর যেন শ্রবণে
বিরাজে আমার ভাবনায়
আর কেউ নয় সে যে কবর স্বয়ং,
সে আমাকে হাসিমুখে স্বাগত জানায়,
কোলে তুলে নেয় আদরে সোহাগে
নির্জন নিস্তব্ধ এ সমাধিস্থলে
কেউ নেই কাছে অমাবস্যার এ রাতে।
আমরা মুখোমুখি দুজনে এ বিজনে
সে বলে যায় আমাকে
চুপি চুপি কানে কানে এ বিজন বিহনে,
“আজ আমি নিজেকে পেয়েছি তোমাতে
পেয়েছি তোমাকে আজ আপন মননে।
যারা আসে এ সমাধিতে
আর কাউকে নয়,
আমি শুধু ভালোবাসি তোমাকে”
আমার প্রত্যয় গভীর হয়,
জানতে চাই, “আমা পরে কেন তুমি প্রসন্ন
কি দিয়ে তোমায় করেছি জয়
আমি তো পূজি নি তোমাকে
কেন তোমার আজের এ সৌজন্য
কিসে আমার এ গৌরব
আমি সামান্য এক,
কিছুই যে নেই দেবার তোমায়”
সে বলে, “তুমি জানো না কি দিলে আমাকে
দিয়ে গেলে একমুঠো ভালোবাসা আমায়,
সবাইকে দেখি কাঁদতে কাঁদতে আসে এখানে
বিরোহিনী কাঁদে বিরহ বেদনায়
সবার অসন্তোষ আমার উপরে
কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যায় ,
আমার পরে কত যুগের সঞ্চিত অভিযোগ।
শুধু তোমাকেই দেখি প্রসন্ন চিত্তে
তুমি পেরেছ আমাকে চিনতে
কোন অভিযোগ নেই আমার পরে
এলে হাসতে হাসতে
ফিরে যাচ্ছ, হাসি দেখি তোমার অধরে
ধন্য আমি তোমাকে পেয়েছি হৃদয় মাঝে”
জীবন মৃত্যুর লুকোচুরি খেলাঘরে
বুঝি আমি আজ
আমি মৃত্যুঞ্জয়ী তার সমাধি অন্তরে।

Song of The Rain কবিতা অবলম্বনে

বৃষ্টির গান

প্রকৃতি নন্দিনী আমি,
দেবীর আশীর্বাদে
আকাশ পথ বেয়ে
মুক্তচ্ছটা হয়ে
বর্ষাই আমি এ ভুবনে,
জল সিঞ্চন আমার,
পাহাড় ভেঙে উপত্যকায়
চাষের খামারে মিলি এসে আমি।

মুক্তার মুকুট দেবীর শিয়রে,
রুপালি মুক্তোর চ্ছটা
বিচ্ছুরিত হয় মুকুট থেকে
আমি সেই বিচ্ছুরিত পাপড়ি,
ঝরিয়ে আনে দেবীকন্যা,
বর্ষায় সে, বৃষ্টি হয়ে নামে এ জগতে
বাগান শোভিত হয় মুক্তোর প্রস্ফুটনে।

আমার চোখের অশ্রু হাসায় পাহাড়কে,
যখন নিজেকে মেলে ধরি ফুলেরা নেচে ওঠে
যদি মাথা নত আমার উৎফুল্ল হয়ে ওঠে সকলে ।

মেঘ আর ধরণীর প্রেম মাঝে
আমি বার্তা বাহক

পৌঁছে দিই একের বার্তা অপরকে
তৃষ্ণা মেটাই একের
অপরের ব্যথার নিরসন আমার সেবায়।

ঝড়ের গর্জন পৌঁছে দেয় আমার আগমন বার্তা
রামধনু জানিয়ে দেয় বিরহ গাঁথা
বাষ্প থেকে জন্ম আমার,
আমি এ পৃথিবীর এক প্রাণী
যাত্রা শুরু পাগলের পদচারণে
আমার সমাপ্তি অনাকাঙ্খিত মৃত্যুর ডানায়।

সমুদ্র গর্ভ থেকে আমি উঠে আসি
বাষ্প হয়ে উড়ি বাতাসে আকাশে
খুঁজি আমি এ পৃথ্বীর কোল
যে দেয় আশ্রয় আমাকে,
আমি নেমে আসি এ ধরায়
প্রতিটি ফুল ও বৃক্ষের আলিঙ্গনে
নিজেকে জড়াই।

আমার আঙ্গুলের নরম স্পর্শ বাতায়নে
আগমনী গান আমার আগমন বার্তায়
সকলের শ্রবণে সে গান
বোঝে না তা সকলে
অনুভবে বাজে সে গান
ছন্দ সুর লয়ে

তপ্ত হাওয়ায় জন্ম আমার
আমারই হাতে মৃত্যু তার
যেমন পুরুষের কাছে লব্ধ শক্তিতে
ঘায়েল পুরুষ নারীর হাতে ।

আমি হয়ে উঠি
অতল সাগরের লাজ
এ ধরণীর হাস্যধ্বনি
আকাশের অশ্রুজল।

সস্নেহ গভীর সাগর তল
লজ্জায় লুকায় অন্তর গভীরে
জলসিঞ্চনে রেঙে ওঠা
এ ধরণীর লাস্য ধ্বনি
স্মৃতির আকাশ ঝরা অশ্রু—-
সকলই যে প্রেম আমার।

রামধনু পৌঁছে দেয় বিরহ বার্তা
অশ্রু ঝরে তার চোখে
ধরণী নেচে ওঠে
আমার আগমন বার্তায়।

আমি খুঁজে ফিরি পৃথিবীর কোল
সে আশ্রয় দেয় আমাকে
সূর্যের উষ্ম স্পর্শে
প্রাণী হয়ে জন্ম আমার এ ধরায়
সময় হলে মৃত্যু ডানা মেলে।

আমার সমাপ্তি এ প্রাণী জগতে
সমুদ্র গর্ভ থেকে ফিরে যাই বাষ্প হয়ে
মাতৃগর্ভে আবার
সেখানে নব জন্ম আমার
আবার বৃষ্টি হয়ে নামি
জন্ম মৃত্যুর আসা যাওয়ার নিয়মে
আমি বাঁচি সকলের মাঝে।

খালিল জীবরানের
A Tear and A Smile কবিতা অবলম্বনে

অশ্রু আর হাসিতে

আমার অন্তর বেদনা
সপি না আমি কাউকে
বিনিময়ে মাগি না
বহুর উৎসব মজলিস।

একবিন্দু অশ্রু
সে হৃদয়ের বিশুদ্ধতা আমার
একগাল হাসি
সে যে পূজার ফুল তার ।
অশ্রু মেলায় আমাকে
হতভাগ্য তাদের সাথে
ভগ্ন হৃদয়ে যারা কেঁদে ফেরে,
একগাল হাসি
সে যে আনন্দ ধারা
ঘোরে ফেরে আমারই অন্তরে।

একবিন্দু অশ্রু,
সে যে আকাশের কান্না,
নেমে আসে তুষার পাতে
পাহাড়ের কোল ধরে
মেলে এসে নদীতে,
একগাল হাসি, নদীতে ডিঙ্গা বায়
স্রোতস্বিনী স্রোত বেয়ে
মেলে এসে সমুদ্র মোহনায়।

আমি বাঁচি আমার প্রত্যয়ে
বাঁচি আমি আমার আশায়
বাঁচি না আমি বিষাদে হতাশায়।

ভালোবাসার ক্ষুধা আমার
আমার অন্তর গভীরে সুন্দরের তৃষা,
আমি যে দেখেছি তাদের
যারা রিক্ত নিঃস্ব
তবু যারা আশায় বুক বাধে
থাকে অপেক্ষায় ;
আমি যে শুনেছি তাদের দীর্ঘশ্বাস
তারই মধ্যে দেখি আমি
মধুরতর সে স্বপ্ন
মধূরতর যা উৎসব মজলিসের চেয়ে।

সূর্য অস্ত যায়, সন্ধ্যা নামে
ফুল চোখ বোজে
সে তার পাপড়ি গুটোতে থাকে।
ঘুমের রাতের কোলে

অপেক্ষা তার কখন আলো ফোটে
সে মেলে এসে ভোরের সকালে
সূর্যের ওষ্ঠ পরে সহাস্য চুম্বনে।

ফুল অপেক্ষায় রত
কখন জীবনে পূর্ণতা আসে,
রাত শেষে ভোর হয় !
সে জাগে তার চোখ খোলে
স্বপ্ন পূরণ হয় জীবনের
অশ্রু আর হাসির সঙ্গমে
জল বাষ্প হয়ে ওড়ে
মেলে এসে মেঘে।

অশ্রু আর হাসির মিলনে
পাহাড় উপত্যকা ছাড়িয়ে
মেঘ ভেসে চলে আকাশে
সে বসে এসে স্নিগ্ধ বাতাসের ডানায়
কান্না হয়ে ঝরে এ ধরণীতে
আমি খুঁজে ফিরি তোমায়;
তুমি কি সেই স্বর্গপুরী মাঝে
ফুল গালিচায় জল সিঞ্চন তোমার,
পুষ্প রাশি তাকিয়ে তোমার দিকে
শিশু যেমন সাগ্রহে তাকিয়ে
মায়ের স্তনপরে দুধের আগ্রহে;
নাকি, তুমি আছ
তোমার হৃদয় অন্তরে
যেখানে পুণ্যার্থে বেদী প্রতিষ্ঠা
তোমাকে সন্মান জানাতে,
যেখানে তুমি ব্যস্ত
আমার হৃদাত্মা উৎসর্গ করতে,
না কি জ্ঞান আহরণ উদ্দেশ্যে
মুখ গুজে পড়ে আছ বইয়ের মধ্যে
তুমি যেমন থাক সত্যনিষ্ঠ ভাবনা নিয়ে।

ও হৃদয়ের বন্ধু আমার,
তুমি আছ কোথায়?
বেদীতে পূজামগ্ন তুমি?
না কি প্রকৃতিকে খুঁজে ফের
তোমার স্বপ্নের মন্দির প্রাঙ্গনে,
তোমাকে পাব কি গরিবের ঘরে
যেখানে তাদের বাস বুকভরা কান্না নিয়ে,
তাদের সান্ত্বনা দাও,
জ্বালা মেটে তাদের
তোমার সিক্ত হৃদয় স্পর্শে,
তোমার দানের সাগর সম্পদে
পূর্ণ হয় তাদের অভাবের ভান্ডার।

খালীল জীবরানের লেখা On Death অবলম্বনে

মৃত্যু রহস্য

যদি জানতে চাও মৃত্যু রহস্য
যদি পেতে চাও তাকে তার মহিমায়
ভাসিয়ে দাও জীবন হৃদয় সমুদ্রে
খোঁজ তাকে জীবন দরিয়ায়
জীবন মৃত্যুর আলিঙ্গনে
তাকে চিনবে তোমার অন্তর্দৃষ্টিতে
পাবে তাকে সৃষ্টির নিয়মে,
যদি না খোঁজ জীবন দুয়ারে,
কোথা পাবে তাকে!
জীবন আর মৃত্যু
সে যে সাগর আর নদী
তফাৎ থাকে না দুজনে।

দিনকানা পেঁচা রাতে দেখে, দেখে না দিনে
আলোর রহস্য সে কি বোঝে?
অমাবস্যার রাত জানে না
কি প্রেম লুকায়
পূর্ণিমার আলোয় রাতের জ্যোৎস্নায়।

তোমার আশা আকাঙ্খার গভীরে
নীরব জ্ঞান লুকায় অন্তহীন অতলে,
তুষার গর্ভে অঙ্কুর স্বপ্ন দেখে
তোমার হৃদয় বসন্ত কবে ফোঁটে,
আস্থা রাখো স্বপ্নে
পৌঁছে দেবে তোমাকে অনন্ত লোকে
অনন্তের দুয়ার যে লুকিয়ে সে স্বপনে।

তোমার মৃত্যুভয় যেন
মেষ বালকের কম্পিত হৃদয়
সে যখন রাজার সামনে দাঁড়ায়
তার মাথায় রাজসন্মান বর্ষায়
তার হৃদয় কেঁপে ওঠে ভয়ে
কম্পিত হৃদয় মাঝে পুলক জাগে
রাখাল বালকের হৃদঅন্তঃপুরে,
রাজ ভূষণ কি শোভে তার অঙ্গে?
তবু নয় কি সে উদ্বেলিত হৃদকম্পনে?

কিসের জন্য মরণ আমাদের
ছাই হয়ে উড়ে যাই বাতাসে?
সূর্য কিরণে গলে যাই মৃত্যু মুহূর্তে,
মৃত্যুতে শ্বাসরুদ্ধ আমাদের।
অশান্ত শ্বাসকষ্টের ঢেউ থেকে মুক্তি মৃত্যুতে
মরণ পরে উত্থান সে অনন্তে
আমরা পাড়ি দিই আনন্দ লোকে।

নীরব গভীর নদীতে জলপান তোমার
তোমার তৃষ্ণা মেটে
তুমি গেয়ে ওঠো অমর্ত সে সংগীত
যখন তুমি পাহাড় শিখরে
যাত্রা শুরু তোমার আকাশ পারে
অঙ্গ হারা তুমি যখন এ জগতে
চলতে অক্ষম তুমি,
তখনই তোমার প্রলয় নাচন
তুমি নেচে ওঠো আনন্দ উৎসবে।
———–

খলিল জীবরানের On Love and Marriage কবিতা অবলম্বনে

প্রেম ও বিবাহ

জন্মসূত্রে তোমরা যমজ দুজনে,
হতে পারে বিবাহ বা প্রেম
পরস্পর বন্ধনে চিরতরে,
তাও জেন সে ঐক্যে দ্বন্দ্ব লুকিয়ে
বাতাসের প্রবাহ দ্বন্দ্বের অলিন্ড ধরে,
যার যার নিজ কক্ষে বাস।
প্রেম সে মুক্ত বাতাস
প্রবাহ তার অন্তহীন আকাশে,
বিবাহ সে থাকে নিজ জগতে
সে বাঁচে নিজ প্রয়োজনে,
কেউ কাউকে বাঁধে না নিজ অধীনে,
যার যার নিজের সত্তা
নিজের ডানায় উড়ে চলে,
যার যার অস্তিত্ব নিজ সমুদ্র প্রবাহে
একসঙ্গে নাচে গায় আনন্দ উৎসবে
তাও যে যার নিজের সত্তায় বাঁচে,
একসঙ্গে ওঠে বসে তাও এক নয় তারা
দুটি ওষ্ঠ একে অপরের সোহাগে
তাও যে যার নিজ তাগিদে বাঁচে,
যেন ওক আর হরিত গাছ
বেড়ে ওঠে স্বাধীন ভাবে
কেউ নয় কারও ছাতার তলে।

খলিল জিবরানের
A Lover’s Call Xxvii কবিতা অবলম্বন

প্রিয়তম তুমি কোথায়

প্রিয়তম, তুমি কোথায়?
আমি খুঁজে ফিরি তোমায়;
তুমি কি সেই স্বর্গপুরী মাঝে
ফুল গালিচায় জল সিঞ্চন তোমার,
পুষ্প রাশি তাকিয়ে তোমার দিকে
শিশু যেমন সাগ্রহে তাকিয়ে
মায়ের স্তনপরে দুধের আগ্রহে;
নাকি, তুমি আছ
তোমার হৃদয় অন্তরে
যেখানে পুণ্যার্থে বেদী প্রতিষ্ঠা
তোমাকে সন্মান জানাতে,
যেখানে তুমি ব্যস্ত
আমার হৃদাত্মা উৎসর্গ করতে,
না কি জ্ঞান আহরণ উদ্দেশ্যে
মুখ গুজে পড়ে আছ বইয়ের মধ্যে
তুমি যেমন থাক সত্যনিষ্ঠ ভাবনা নিয়ে।

ও হৃদয়ের বন্ধু আমার,
তুমি আছ কোথায়?
বেদীতে পূজামগ্ন তুমি?
না কি প্রকৃতিকে খুঁজে ফের
তোমার স্বপ্নের মন্দির প্রাঙ্গনে,
তোমাকে পাব কি গরিবের ঘরে
যেখানে তাদের বাস বুকভরা কান্না নিয়ে,
তাদের সান্ত্বনা দাও,
জ্বালা মেটে তাদের
তোমার সিক্ত হৃদয় স্পর্শে,
তোমার দানের সাগর সম্পদে
পূর্ণ হয় তাদের অভাবের ভান্ডার,
তোমার পূণ্য হৃদয়স্পর্শ সর্বত্র বিরাজে,
কালজয়ী তুমি তুমি যে মহান।
মনে কি পরে তোমার
যেদিন প্রথম দেখা আমাদের,
তোমার হৃদয়ের ডাক
উদ্বেলিত আমরা সবাই
প্রেম ডানা মেলে ভাসে
তোমার মহানুভবতা তার গানে,
মনে কি পড়ে তোমার
বৃক্ষশাখার ছায়াতলে আমরা বসে
মানবতার আশ্রয়ে নিরাপদে,
হৃদয়ের পূণ্য গোপনিয়তাকে
আঘাতের হাত থেকে
যেভাবে রক্ষা করে হৃদয় পিঞ্জর।

মনে কর সেদিন
হেটেছিলাম হাতে ভর করে
পায়ের চিহ্ন ধরে

বনানী মাঝে হামাগুড়ি দিয়ে
পরস্পর একে অপরকে জড়িয়ে
মাথা ঝুঁকিয়ে
যেন নিজেদের মধ্যে চেয়েছি
নিজেদের লুকিয়ে রাখতে।

মনে করে দেখ সেদিন
বিদায় জানিয়েছিলাম তোমাকে
আমার ঠোঁটে তোমার চুম্বন স্পর্শ
আমি বুঝতে পারি
সে যে প্রেমের প্রতীক আমাদের
সে এক স্বর্গীয় গোপনতা
জিভে যা উচ্চারিত হতে পারে না

দুর্লভ সে শান্তির চুম্বনসস্পর্শ
এ যেন পরমেশ্বরের নি:শ্বাস
সে নিঃশ্বাসে
মানব জন্ম এ ধূলিতে

সে প্রশান্ত দীর্ঘশ্বাস
আমাদের নিয়ে যায়
নৈসর্গিক এক স্বর্গ জগতে
আমার হৃদয়ের মাহাত্ম মাঝে
তুমি বেঁচে থাক
যতক্ষণ না দেখা হয় দুজনে আবার

মনে পরে তোমার চুম্বন যখন আমাকে
তোমার গাল বয়ে অশ্রু ঝরে
তুমি বল আমাকে
পার্থিব জগতের প্রয়োজনে
পার্থিব এ দেহ আলাদা বাঁচে
সে যেন পৃথিবীর দরকারে আলাদা থাকে
কিন্তু আত্মিক গ্রন্থিতে সে মেলে প্রেমে নীরবে
মৃত্যু এসে তাদের নিয়ে যায় অনন্ত সে ধামে

প্রিয়তম আমার, তুমি যাও,
প্রেমের দরবারে তুমি অতিথি
সেই সুন্দর যে তার অনুগামীকে
তুলে দেয় জীবনের মধু ভান্ডার,
আমার এই শূন্য বাহুর জন্য
তোমার প্রেম রয়ে যাবে শাশ্বত
অনন্ত সে প্রেম
আমার বর মাল্য তোমার গলে
অমর আমাদের বিবাহ বন্ধন।

কোথায় তুমি! প্রিয়তম, আমার আমি
রাতের নির্জনতায় তুমি কি জাগ?
বিশুদ্ধ বাতাস তোমাকে পৌঁছে দিক
আমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন
প্রেমের স্পর্শ।

তোমার স্মৃতিতে আমার ছবি ভাসে
সে নয় ছবি আমার
দুঃখের ছায়া আজ
আমার অতীত আনন্দমুখর মুখাবয়বে।

যে চোখ ছিল তোমার সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি
তা আজ হারিয়ে গেছে ফুলে ওঠা এ মুখে
তোমার চুম্বনে সিক্ত মিষ্ট ওষ্ঠ
আজ সে শুকিয়ে মরে।

তুমি কোথায় প্রিয়তম
সমুদ্র ওপার থেকে,
শুনতে পাচ্ছ কি আমার কান্না?
আমার প্রয়োজন কি তুমি বুঝতে পারছ?
আমার ধৈর্যের মাহাত্ম কি তোমার জানা?

কোন অশরীরি কি বাতাসে আছে
যে পৌঁছে দেবে এ বার্তা
অর্ধমৃত সে যুবার কথা

দেবদূতদের মধ্যেকার কোন গোপন যোগাযোগ
আমার নালিশ কি নিয়ে যাবে তোমার কাছে

কোথায় তুমি সুন্দরী আমার?
জীবনের অস্পষ্টতা
আমার ওপর অধিষ্ঠিত করেছে তার হৃদয়
আমাকে জয় করেছে আমার দুঃখ।

বাতাসে তোমার হাসি ভাসিয়ে দাও
সে আসবে আমাকে উজ্জীবিত করবে
তোমার নিঃশ্বাস পড়ুক বাতাসে
আমাকে সে বাঁচিয়ে রাখবে।

প্রিয়তম, তুমি কোথায়?
প্রেম কত মহৎ
আমি ক্ষুদ্র এক!
——–

FEAR
Khalil Gibran

Fear কবিতা অবলম্বনে

জীবন পিছু ফেরে না

পাহাড়ের উত্তুঙ্গ থেকে
গিরি পথ ধরে
গ্রাম জঙ্গল পেরিয়ে
উত্তাল বাতাসে ভেসে
নেমে আসে ঝর্ণা
মেলে এসে নদীতে,
স্রোতস্বিনী চলে নিজ গতিতে
স্রোতের ডিঙা বেয়ে
মিলবে এসে সাগরে।

সামনে দিগন্ত বিস্তীর্ণ সমুদ্র
কি জানি যদি প্রবেশের মুখে
সে হারিয়ে যায় সমুদ্র গর্ভে!

থমকে দাঁড়ায় সে,
কেঁপে ওঠে সন্ত্রস্ত ভয়ে,
সে পেছন ফেরে
ফিরে যেতে চায়,
কিন্তু নদী যে ফিরতে পারে না!
একবার যদি আসে এ পৃথ্বীতে
কেউ পারে না ফিরতে
ফেরা যে অসম্ভব।

নদীকে ঝুঁকি নিতে হয়
মিললে সমুদ্রে সেই মোহনায়
ভয় নিজেই পালায়,
নদী বোঝে তার উপলব্ধিতে
যদি সে মেলে এ অঙ্গনে
হারিয়ে সে যায় না
সমুদ্র যে স্বজন
সে তার আলিঙ্গনে
তারই মাঝে সে হয়ে যায় একজন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top