ফোঁস করো – শম্পা সাহা

আমার মা ছোট বেলায় একটা গল্প খুব বলতেন।

আমার মা ছোট বেলায় একটা গল্প খুব বলতেন।

একটা বিষধর সাপ এক বড় বট গাছের কোটরে থাকতো। সামনে বিশাল মাঠ, কিন্তু সাপটার ভয়ে ঐ মাঠের ধার কেউ ঘেঁষতো না।

কাউকে দেখলেই সাপটা ছুটে এসে কামড় বসাতো। কত যে গরু , ছাগল প্রাণ হারিয়েছে ঐ সাপের ছোবলে তার ইয়ত্তা নেই। মানুষ বিশেষ করে ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য ঐ মাঠ যেন মৃত্যু পুরী আর সাপটা স্বয়ং মৃত্যুদূত।

ধীরে ধীরে ঐ এলাকায় মানুষের চলাচল প্রায় বন্ধই হয়ে গেল, কেউ যদি পথ ভুলে চলে যেত হয় ঐ বিষাক্ত সাপের ছোবল বা তাড়া ছিল অনিবার্য।

একদিন এক মহান তপস্বী ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছেন, তার ঐ সাপের গল্প জানা নেই! এদিকে মানুষের পায়ের কম্পনে সাপটা বুঝতে পারে পশু বা মানুষ কেউ একটা তার সীমানায় পা রেখেছে, ওমনি সে ও তার স্বভাব মত ছুটে যায় কামড়াতে।

প্রবল ফোঁস ফোঁস শব্দ সাধু চমকে সামনে দেখেন, এক বিশাল সাপ ফণা তুলে দাঁড়িয়ে । সাধু তাড়াতাড়ি তার মন্ত্র প্রয়োগ করে ঐ মুহুর্তের জন্য সাপের তেজ প্রশমিত করেন।

এরপর ঐ বটগাছের গোড়ায় বসে, সাপের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন, “এত রাগ কেন তোর, শান্ত হ, ধৈর্যশীল হ, সহনশীল হ,আর অকারণ কাউকে কামড়াস না! ” সাধু সাপটিকে অনেক আশীর্বাদ করে চললেন নিজের পথে।

সাপটি এরপর থেকেই একেবারে অন্যরকম। কোটরে থেকে দিন কাটায়, কখনো মাঝে মাঝে বাইরে যায় শিকারের জন্য, কিন্তু আর কাউকে দেখলে তেড়েও যায় না, কামড়ায়ও না!

দুএকটা ছাগল মাঝে মাঝে ভুলে ঐ মাঠে চলে আসলেও সাপটা তাদের কামড়ায় না। এরপর ধীরে ধীরে মানুষের চলাচল শুরু হল আবার, বাচ্চারাও খেলাধুলা করতে আসতো, রাখাল তার গরু নিয়ে মাঠে ছেড়ে ঐ বটগাছের তলায় শুয়ে দুপুরের ঘুমটা শেষ করতো। সাপটা আর কারো কোনো ক্ষতি করতো না।

দুষ্ট ছেলেরা ঐ বটগাছের ঝুরি ধরে দোল খেতো, প্রথম প্রথম সাপটা কে বের হতে দেখলে দৌড়ে পালাতো।কিন্তু যখন দেখলো যে কামড়ানো তো দূরের ব্যাপার সাপটা আর তাড়া ও করে না, ফোঁস ও না, ব্যস। দুষ্ট ছেলেরা সাপটাকে ঢিল মারত শুরু করে, কাঠি দিয়ে খোঁচাতো,খোয়ার ঘা খেয়ে সাপটার লেজে ঘা পর্যন্ত হয়ে গেল।

সাপের ভীষণ কষ্ট হয়, রাগও কিন্তু সাধু হিংসা করতে বারণ করেছেন তাই সাপটা চুপ করে সব সহ্য করে। শেষে এমন অবস্থা হল, যে শিকার করতেও সে আর বের হতো না! একে তো লেজে ঘা, তার উপরে বাইরে বের হলেই ছেলেরা ঢিল ছুঁড়ে মারে! না খেতে পেয়ে পেয়ে সাপটা প্রায় মৃতপ্রায়।

একদিন সাধু ঐ রাস্তা দিয়েই তার আশ্রমে আবার ফিরছেন। মাঠের কাছে আসতেই তাঁর মনে পড়লো সাপটার কথা। ভাবলেন, “দেখি তো সাপটা কেমন আছে? “

গাছের কোটরের সামনে গিয়ে বহুবার তিনি ডাকলেন কিন্তু কই, কিছুরই তো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। শেষে অনেক্ষণ পর একটা ক্ষীণ স্বর শুনতে পেলেন, ” প্রভু আমি এখানে “, অতি কষ্টে সাপটা গর্ত থেকে মাথা বার করলো!

” এ কি!এ কি অবস্থা হয়েছে তোর? “, সাধু দেখেন সাপটার লেজের কাছে এক বিরাট দগদগে ঘা! ” কি রে, তোর এই অবস্থা কেন? “, ” প্রভু আপনি হিংসা করতে বারণ করেছিলেন তাই আমি আর কাউকে কামড়াই না, তাড়াও করি না, তাই দুষ্ট ছেলেরা আমাকে মেরেছে আর তাতেই এই! “

সাধু মুচকি হেসে তাঁর হাতের কমন্ডলু থেকে মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে সাপটিকে সুস্থ করে তুললেন। তার পর বললেন, “ওরে মূর্খ, আমি তোকে কামড়াতে বারণ করেছি, ফোঁস করতে নয়! ফোঁস করবি, না হলে নিজেকে বাঁচাবি  কি করে? “

এরপর থেকে সাপটা কাউকে কামড়াতো না কিন্তু তেড়ে যেতো, আর তাতে ভয় পেয়ে লোকেরা ওর থেকে দূরে থাকতো। সাপটার শিকার খুঁজতে বা স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকতে আর কোনো অসুবিধাই রইলো না।

আমাদের জীবনেও তাই, সব অন্যায় এর ন্যায় বিচার হয়তো করতে পারি না, সব অপমানের হয়তো শোধ নিতে পারি না, সব ভুলের হয়তো ঠিকটা করা আমাদের সাধ্যে কুলায় না, অনেক সময় একটা চড় খেয়ে উল্টে চড় মারা যায় না কিন্তু প্রতিবাদটা অবশ্যই দরকার। যাতে দ্বিতীয় বার আপনার সঙ্গে এই অন্যায়টা করার আগে সে মানুষটা ভাবতে বাধ্য হয়।

কামড়ানোর দরকার নেই শুধু ফোঁস করুন দেখবেন অনেক সমস্যার কিছু সমাধান তো হবেই।

(অনুপ্রেরণা-কথামৃত আর আমার মায়ের কাছে শোনা কথাগুলো)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top